নরেন্দ্র মোদীর শাসনে সারা দেশে হিন্দুত্বের রাজনীতি ‘ভিন্ন মাত্রা’ পেয়েছে বলে অনেকেরই অভিমত। জাতীয়তাবাদ এবং দেশপ্রেমের সঙ্গে কৌশলে হিন্দুত্বকে মিশিয়ে দেওয়াও গত ১১ বছরে একাধিক সময়ে ঘটেছে। পহেলগাঁওয়ে জঙ্গি হামলা এবং তার পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানকে ‘জবাব’ দিতে ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর ফলে পুনরায় একটি আবহ তৈরি হয়েছে।

পেহেলগামের ঘটনার পর ভারতীয় সশস্ত্রবাহিনীর ‘অপারেশন সিন্দুর’-কে সমর্থন করে পাকিস্তান সম্পর্কে শুরু থেকেই কঠোর অবস্থানে থাকে তৃণমূল। গত শনি-রবিবার সেনাবাহিনীকে সেলাম জানাতে তৃণমূল কংগ্রেস পাহাড় থেকে সাগর পর্যন্ত তাদের সংগঠনকে রাস্তায় নামিয়েছে মিছিলে, হাতে ছিল জাতীয় পতাকা। উল্টোদিকে রাজনৈতিক কর্মসূচির ডাক দিয়েছে বিজেপি, উভয় তরফের প্রতিযোগিতা চলছেই। সূত্রের খবর, জাতীয়তাবাদ ও হিন্দুত্বের তাস এবার হাতছাড়া হতে চলেছে বিজেপির।

আনুষ্ঠানিক ভাবে না হলেও তার একটি ব্যাখ্যাও শাসক শিবির থেকেই মিলছে।

গত কয়েকটি ভোটে তৃণমূলের কাছে একটি চিত্র পরিষ্কার। তা হল, বিশাল কোনও ওলটপালট না-হলে বাংলার সংখ্যালঘু ভোট তৃণমূলের দিকেই থাকবে তৃণমূল কংগ্রেসের কয়েকজন প্রথম সারির নেতাদের অনেকেরই ব্যাখ্যা, লক্ষ্মীর ভান্ডার, কন্যাশ্রীর মতো সরকারি পরিষেবামূলক কর্মসূচির ফলে তৃণমূলের ভিত মজবুত। অপরদিকে হিন্দু ভোট এককাট্টা করে বিজেপি সেই ভিতে আঘাত করতে চায়। পদ্মশিবিরের সেই কৌশল মাথায় রেখেই সাংগঠনিক এবং রাজনৈতিক কর্মসূচির নকশা আঁকা হচ্ছে তৃণমূলের অন্দরে।

‘পরিবর্তনের’ ১৪ বছর! নজির গড়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তিন মেয়াদে তিন বার পাল্টেছে বিরোধী দল, কেন বাংলায় বারবার ‘চলো পাল্টাই’?

রাজ্যে মোট ভোটের প্রায় ৩৩ শতাংশ সংখ্যালঘু অংশের। তৃণমূল চায় সংখ্যালঘুদের একচেটিয়া সমর্থন পেতে। নওশাদ সিদ্দিকিদের আইএসএফ গত বিধানসভা ভোটে একটি আসন জিতলেও বহু আসনে ভাল পরিমাণ ভোট পেয়েছিল। আইএসএফের ভোটের মূল ভিত্তি সংখ্যালঘুরাই। আগামী বিধানসভায় তাদের ভূমিকা কী হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয় । তৃণমূল চাইছে জাতীয়তাবাদ এবং হিন্দুত্ব নিয়ে বিজেপি-র একার রাজনীতি করে হিন্দু ভোটের ‘মেরুকরণ’ ঠেকাতে।

প্রসঙ্গত, রাজ্যের ৭৪টি আসনের ভোটের ফলাফল পুরোপুরি সংখ্যালঘু ভোট-নির্ভর। আরও ২৫টি আসন রয়েছে যেগুলিতে সংখ্যালঘু ভোট ‘নির্ণায়ক’। তৃণমূলের ধারণা, এই ১০০ আসনের প্রায় সব’কটিতেই তারা নিরঙ্কুশ জয় পাবে। বাকি ১৯৪টি আসনে যাতে হিন্দুভোট একত্রিত না-হয়, আপাতত সেটাই তৃণমূলের কৌশল।

তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষের বক্তব্য, ‘‘বিজেপির স্বাধীনতা সংগ্রামে কোনও ভূমিকা ছিল না। ফলে ওদের দেশপ্রেম আরোপিত এবং মেকি। তাতে ধর্ম মিশে থাকে। হিন্দু জওয়ানের মৃত্যু হলে বিজেপি রাজনীতি করে। কিন্তু ঝন্টু আলি শেখের বেলায় রা কাড়ে না। তৃণমূল তা করে না।’’ পাল্টা রাজ্যসভার বিজেপি সাংসদ শমীক ভট্টাচার্য বলেন, ‘‘তৃণমূল যা করছে, তা দেখে লোকে হাসাহাসি করছে। বিজেপি যে বোধ নিয়ে রাজনীতি করে, তা তৃণমূল রপ্ত করতে পারবে না। আমরা পঞ্চাশের দশক থেকে আমাদের মতাদর্শে অটল রয়েছি।’’

বাংলার রাজনীতিতে বিজেপি যে তাদের রাজনৈতিক অভিমুখকে ক্রমশ ‘জাতীয়বাদ’ থেকে ‘হিন্দু জাতীয়তাবাদ’-এর দিকে নিয়ে যাচ্ছে, তা বিভিন্ন বক্তব্য এবং ঘটনাক্রমে স্পষ্ট। বিশেষত, বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর কথাবার্তা, বিবৃতি, প্রতিক্রিয়া সেই ধারণাকে আরও জোরালো করছে। দিঘায় নির্মিত জগন্নাথ মন্দির নিয়ে বিজেপির রাজনৈতিক সমালোচনার শেষ নেই । বিশেষত শুভেন্দু শিবির (যদিও দিলীপ ঘোষ সস্ত্রীক দিঘায় গিয়ে হাজির হওয়ায় এবং মন্দির নির্মাণ নিয়ে মমতার প্রশংসা করায় বিজেপি-কে খানিকটা পিছনের পায়ে যেতে হয়েছে)। পদ্মশিবিরের সমালোচনাকে হাতিয়ার করে আবার তৃণমূল এই ভাষ্য তৈরির চেষ্টা করেছে যে, মমতার বিরোধিতা করতে গিয়ে বিজেপি মন্দিরেরও বিরোধিতা করছে।

শুধু তা-ই নয়। জঙ্গি কার্যকলাপে পাকিস্তানের মদত নিয়ে সরব হয়েছে এমনকি, পাক অধিকৃত কাশ্মীরকে ছিনিয়ে আনাও সময়ের দাবি বলে মন্তব্য করেছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। যিনি আপাতত সন্ত্রাসবাদের নেপথ্যে পাকিস্তানের ভূমিকা তুলে ধরতে বিশ্বমঞ্চে ভারতের প্রতিনিধিদলের অংশ হয়ে জাপান সফরে রয়েছেন। যাবেন আরও চারটি দেশে অভিষেকের যাওয়া প্রসঙ্গে শুভেন্দু বলেছেন, ‘‘যাঁকে বিদেশে যাওয়ার জন্য হাই কোর্ট, সুপ্রিম কোর্টের অনুমতি নিতে হয়, যাঁর পাসপোর্ট জমা থাকে ইডি-র কাছে, তিনি দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন না।’’ তৃণমূল সেই বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলতে শুরু করেছে, অভিষেকের বিরোধিতা করতে গিয়ে শুভেন্দু দেশের প্রতিনিধিত্বকেও অস্বীকার করছেন। যেমন মমতার বিরোধিতা করতে গিয়ে দিঘার মন্দিরকে অসম্মান করেছেন তিনি।

Leave a comment